ঢাকা , শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , ১১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিমলায় ভুল ল্যাব রিপোর্টে ভোগান্তি রোগীদের

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২৪-০৪-২০২৬ ১০:১৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ২৪-০৪-২০২৬ ১০:১৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
ডিমলায় ভুল ল্যাব রিপোর্টে ভোগান্তি রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর
মোঃ লিখন ইসলাম (নীলফামারী)প্রতিনিধি : নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ল্যাব রিপোর্ট নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় ভুল ও পরস্পরবিরোধী রিপোর্টের অভিযোগে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে। ৭ বছর বয়সী শিশু সোহান এর জ্বর, সর্দি-কাশি দেখা দিলে স্থানীয় চিকিৎসকের পরামর্শে স্কোয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করানো হয়। সেখানে শিশুটির রক্তে আরবিএস ১২.৬ এবং ইউরিনে সুগার +++ দেখিয়ে ডায়াবেটিস পজেটিভ রিপোর্ট দেওয়া হয়। এমন রিপোর্ট হাতে পেয়ে শিশুটির পিতা মাতা চরম আতঙ্কে পড়ে এবং দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৬ এপ্রিল রংপুরের স্বনামধন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পুনরায় পরীক্ষা করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়। সেখানে খালি পেটে রক্তে সুগার ৩.৭০ এবং খাবারের দুই ঘণ্টা পর ৪.২৮ ধরা পড়ে, যা স্বাভাবিক মাত্রার মধ্যে। একইভাবে ইউরিন পরীক্ষাতেও ডায়াবেটিস নেগেটিভ আসে। এতে প্রাথমিক রিপোর্টটি ভুল বলে প্রমাণিত হয়। শিশুটির পিতা আহিনুর রহমান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মচারী। তিনি ছুটিতে এসে শিশু সোহানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে গিয়ে রিপোর্ট নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েন। ভুল রিপোর্টের কারণে তিনি অতিরিক্ত ১০-১২ হাজার টাকা ব্যয় করেন এবং মানসিকভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। অন্যদিকে, জন্ডিস রোগ নির্ণয়কে কেন্দ্র করে আরেকটি বিভ্রান্তিকর ঘটনা সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী রোগী জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে জন্ডিসে ভুগছিলেন, ১৫ এপ্রিল একই দিনে ডিমলা মেডিকেল মোড় এলাকার সোহেল ডায়াগনস্টিক সেন্টার, স্কোয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রক্ত পরীক্ষা করান। মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের ব্যবধানে করা তিনটি পরীক্ষায় তিন রকম ফলাফল আসে। স্কোয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিলিরুবিন ২৬.২, সোহেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১০.৫ এবং ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১২.৫ রিপোর্ট পাওয়া যায় । ফলে এত বড় পার্থক্য রোগীর স্বজনদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ল্যাব টেকনোলজিস্ট কবীর হোসেন জানান, মেশিন ও রিএজেন্টের ভিন্নতার কারণে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে, তবে ১০.৫ ও ১২.৫ কাছাকাছি হওয়ায় তা তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য। ২৬.২ রিপোর্টটি সন্দেহজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, “একই রোগীর ক্ষেত্রে এত বড় পার্থক্য স্বাভাবিক নয়। এটি টেকনোলজিস্টের গাফিলতি বা রিএজেন্টের ত্রুটির কারণে হতে পারে।” তিনি রোগীর সঠিক চিকিৎসার জন্য পুনরায় নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। তবে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর টেকনোলজিস্টরা নিজেদের রিপোর্টকে সঠিক দাবি করেছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চিকিৎসকদের মতে, জন্ডিস নির্ণয়ে সাধারণত বিলিরুবিন মাত্রা পরিমাপ করা হয় এবং একই সময়ে নেওয়া নমুনায় এত বড় পার্থক্য অস্বাভাবিক। ল্যাব টেকনোলজিস্টের দক্ষতার অভাব কিংবা অসতর্কতার কারনে এমন রিপোর্ট আস্তে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। একটি ভুল রিপোর্ট রোগীর চিকিৎসাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা । একই দিনে একাধিক স্থানে পরীক্ষা না করানো, বিশ্বস্ত ও মানসম্পন্ন ল্যাব নির্বাচন করা, অস্বাভাবিক রিপোর্ট পেলে পুনরায় পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং ল্যাবের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। ডিমলার সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করে, সঠিক চিকিৎসার জন্য নির্ভুল পরীক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সচেতনতা বাড়লেই এমন বিভ্রান্তি কমবে এবং রোগীরা পাবে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা সেবা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ